পৃষ্ঠাসমূহ
আজকের পাঠক
মঙ্গলবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১১
নবীগঞ্জের কসবায় ২২ বছরের বিভৎস নৃশংসতা ॥ আব্দুল হকের টাকা, গোলাম হোসেনের লাঠি, লিপাই মিয়ার ২৯ বিয়ে
এম এ মজিদ ও আব্দুর রউফ সেলিম, কসবা (নবীগঞ্জ) থেকে ফিরেঃ ২২ বছর যাবত থেমে থেমে সংঘর্ষ চলে আসছে নবীগঞ্জের কসবা গ্রামে। ১৯৮৯ সাল থেকে বিরোধের সুত্রপাত। একপক্ষের নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক চেয়ারম্যান লিপাই মিয়া, আরেকটি পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন আব্দুল হক ও গোলাম হোসেন। প্রায় প্রতি বছরই কসবা গ্রামে আধিপত্যের জানান দিতে সংঘর্ষের আয়োজন করা হয়। সর্বশেষ গত ১২ b‡f¤^‡ii সংঘর্ষের বিষয়টি দেশ বিদেশে ব্যাপক আলোচিত হয়। গ্রামের অধিকাংশ প্রবাসী। প্রায় ৪ হাজার মানুষের বসবাস কসবা গ্রামে। রয়েছে কিন্ডার গার্টেন ও প্রাইমারী স্কুল। পার্শ্ববর্তী ইনাতগঞ্জে রয়েছে স্কুল কলেজ মাদ্রাসা। বিবিয়ানা গ্যাস ফিল্ডের পার্শ্ববর্তী হওয়ায় কসবা গ্রামের পরিচিতি আরও বেড়ে যায়। শিক্ষিতের হার নগন্য। ৪ হাজার মানুষের মাঝে প্রাইমারী স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র ২৭১ জন। কিন্ডার গার্টেন স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা শ’খানেকের মতো। কলেজ মাদ্রাসায় অধ্যয়নরতের সংখ্যা হাতেগুনা কয়েকজন। কিছু উচ্চ শিক্ষিত লোকজন রয়েছে যারা গ্রামে থাকেন না, অনেকে বিদেশে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে সেখানেই বসবাস করছেন। বাদবাকী সবাই ¯^শিক্ষিত, ¯^í wkw¶Z ও অশিক্ষিত। ধনীক শ্রেণীর সাথেই রয়েছে অতি দরিদ্রদের বসবাস। ভিটেমাটি নাই এমন জনসংখ্যাও রয়েছে সেখানে। মোটামুটি এই হল সামপ্রতিককালে হবিগঞ্জের মধ্যে সবচেয়ে সমালোচিত গ্রাম কসবা। নবীগঞ্জের আরেক আলোচিত গ্রাম সাকুয়ায় পরপর ৮টি মার্ডার সংঘটিত হওয়ার পর বর্তমানে শান্ত। মারদাঙ্গা ও লাশ বিক্রির জন্য ব্যাপকভাবে সমালোচিত ছিল নবীগঞ্জের বোরহানপুর গ্রাম। পরপর ২টি হত্যাকান্ডের পর বোরহানপুর গ্রাম বর্তমানে তেমন আলোচনায় নেই। বেশ কিছুদিন যাবত আলোচনা থেকে বাদ রয়েছে সাকুয়া গ্রামও। =১২ b‡f¤^‡ii বিভৎস নৃশংসতা=
বেশ কিছুদিন যাবতই লিপাই মিয়ার লোকজনের সাথে গোলাম হোসেনের বিরোধ চলে আসছিল। ১২ b‡f¤^i সকাল ৯টায় সংঘর্ষ শুরু হয়। উভয় পক্ষ নিজ নিজ এলাকার মসজিদের মাইকে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে আহবান জানান। কয়েক ঘন্টা সংঘর্ষ হয়। অন্তত ৫০টি বাড়ি সম্পুর্ণভাবে লুটপাট করা হয়। লুটপাট হওয়া বাড়িঘরের মধ্যে প্রায় সবগুলোই লিপাই মিয়ার আত্বীয় ¯^R‡bi| ক্ষয়ক্ষতির পরিমান প্রায় ১ কোটি টাকা। আহতের সংখ্যাও অর্ধশত। সংঘর্ষের ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া ৭ জনের মাঝে ৫জনই গতকাল জামিনে ছাড়া পেয়েছে। ফলে ওই এলাকায় আতংক আরও বেড়ে গেছে। কসবা গ্রামে প্রায় ১০ বছর পূর্বে আলেম উদ্দিন নামের এক যুবক প্রতিপক্ষের আঘাতে নিহত হয়। বিষয়টি আপোষে মিমাংসা হয়। কসবা গ্রামের বিরোধ মিমাংসা করতে সামাজিক উদ্যোগও নেয়া হয়। সংসদ সদস্য শেখ সুজাত মিয়া, উপজেলা চেয়ারম্যান দেওয়ার গোলাম সারোয়ার হাদীগাজী, আওয়ামীলীগের সভাপতি ডাক্তার মুশফিক হোসেন চৌধুরী এসব আপোষ মিমাংসায় অগ্রনী ভূমিকা পালন করেন। কোনো চেষ্টাই কসবা গ্রামে শান্তি ফিরিয়ে আনতে পারেনি।
=লিপাই মিয়ার ২৯ বিয়ে=
লিপাই মিয়া ছিলেন দিঘলবাগ ইউনিয়নের ৪ বারের চেয়ারম্যান। কঠোরহস্তে শাসনের জন্য তিনি ছিলেন ব্যাপক আলোচিত সমালোচিত। ৫ বছর পূর্বে তিনি মারা যান। বৃহত্তর সিলেটের প্রভাবশালী ইউপি চেয়ারম্যানদের মধ্যে আজরিমীগঞ্জের হাফিজুর রহমান হাফাই মিয়ার পরই লিপাই মিয়াকে গন্য করা হতো। জীবিতকালে বিভিন্ন কারণে তিনি ছিলেন সমালোচিত। এর মধ্যে অন্যতম ছিল বহু বিয়ে। বছরে বছরে বিয়ে করা তার এক ধরনের অভ্যাসে পরিনত হয়েছিল। নিজ গ্রাম কসবা থেকে শুরু করে বিভিন্ন জেলা পেরিয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাড়ি গোপালগঞ্জের মোলারহাট গ্রামে গিয়েও একাধিক বিয়ে করেন লিপাই মিয়া। সর্বকনিষ্ট স্ত্রী ফাতেমা বেগমের বাড়ি গোপালগঞ্জ। এলাকাবাসী জানান- ২৯টি বিয়ে করেছেন লিপাই মিয়া। স্ত্রীদের ঘরে ৮ ছেলে ১২ মেয়ের সন্ধান পাওয়া যায়। লিপাই মিয়ার ছেলে মেয়েদের সংখ্যা অর্ধশত ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারনা করা হচ্ছে। মৃত্যুর পরও নাকি অনেক নারী লিপাই মিয়ার স্ত্রী হিসাবে দাবী নিয়ে এসেছিল কসবা গ্রামে। ২ ছেলে লন্ডন প্রবাসী। এক ছেলে রানা শেখ গত ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী ছিলেন। বড় ছেলে এনামুল হক আখলী মিয়াও বিয়ে করেছেন এক ডজনের মতো। লিপাই মিয়ার স্ত্রীর মধ্যে কসবা গ্রামের সামিনা বেগম, জয়তুরী বেগম, যাত্রাপালা থেকে বিয়ে করা রুপা, মর্জিনা, সৌরভী বেগম উলেখযোগ্য। লিপাই মিয়ার ছেলে আখলী মিয়ার স্ত্রীদের মধ্যে সুফিয়া বেগম, দিনারপুর ও সৈয়দপুরের ২ মহিলার সন্ধান পাওয়া গেছে। সৈয়দপুরের স্ত্রীর সাথে আখলী মিয়ার মামলা মোকাদ্দমার ঘটনা ঘটেও। আখলী মিয়া ২ হিন্দু মেয়েকেও বিয়ে করেন বলে গ্রামবাসী জানান। নবীগঞ্জে বহু বিবাহের পরিবার হিসাবে লিপাই মিয়ার পরিবারটি ব্যাপকভাবে পরিচিত। লিপাই মিয়ার স্ত্রী, সন্তান সন্তুতী নাতী নাতনীর সংখ্যা কসবা গ্রামে একশরও উপরে।
= টাকা দেয় গৌরীসেন=
কসবা গ্রামে দাঙ্গা হাঙ্গামার অন্যতম নাটেরগুরু হিসাবে পরিচিত ধনকুবের আব্দুল হক। আব্দুল হকের পরিবারের অধিকাংশ সদস্য লন্ডনে ভাল অবস্থানে। রয়েছে অঢেল সম্পদ। আব্দুল হকের পক্ষে রয়েছে ফারুক মিয়া, লুৎফুর মিয়াসহ অনেকেই। আব্দুল হকের গোষ্টি বড় হলেও মারামারিতে তেমন সিদ্ধহস্ত নয় বলে জানা গেছে। এক্ষেত্রে টাকা দিয়ে পুষিয়ে দেয় আব্দুল হক। গতকাল আব্দুল হকের বাড়িতে গিয়ে কোনো পুরুষকে পাওয়া যায়নি। ১২ b‡f¤^i সংঘর্ষের পর থেকেই পলাতক। তবে পুলিশ ওই বাড়িতে একবারও যায়নি বলে এলাকাবাসী জানান। আব্দুল হকের স্ত্রী সামা বেগম জানান- সংঘর্ষের বিষয় তিনি অবগত নন। ¯^vgx কেন পলাতক তাও তিনি জানেন না। বহু চেষ্টা করেও আব্দুল হকের মোবাইল bv¤^vi সংগ্রহ করা যায়নি। আব্দুল হকের পরিবারের স্কুল পড়ুয়া ১০ বছরের কন্যা সন্তানটি পর্যন্ত তথ্য আড়াল করতে পারদর্শী। আব্দুল হকের পক্ষের প্রায় ২শ লোক লন্ডন প্রবাসী। গ্রামে একক আধিপত্য বিস্তার করতে ১২ b‡f¤^‡ii পর ১ কোটি টাকার একটি অলিখিত বাজেট অনুমোদন দিয়েছে আব্দুল হকের পঞ্চায়েত কমিটি। এর অধিকাংশই বহন করবে আব্দুল হকের পরিবার। এমনটাই বলেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকাবাসী।
=গোলাম হোসেনের লাঠি=
দিঘলবাগ ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি গোলাম হোসেন। গত ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে পরাজিত হন। পরাজয়ের জন্য দায়ী করা হচ্ছে লিপাই মিয়ার পুত্র রানা শেখকে। গোলাম হোসেনের ধারনা রানা শেখ না দাড়ালে তিনিই বিজয়ী হতেন। নির্বাচনের পর থেকেই শুরু হয় প্রতিশোধ নেয়ার সাধ। গোলামের হোসেনের গোষ্টি বড় না হলেও রয়েছে লাঠির জোর। মারদাঙ্গায় সিদ্ধহস্ত গোলাম হোসেনের লোকজন ঘন্টার পর ঘন্টা সংঘর্ষে লিপ্ত থাকতে পারে। টাকার নিশ্চয়তা পেলে গোলাম হোসেনের কাছে এসব যেন কিছুই না। অনেক খোজাখোজির পর গোলাম হোসেনের সাথে সাক্ষাত হয় অজ্ঞাত একটি জায়গায়। খুলে বলেন সবকিছু। লিপাই মিয়ার গোষ্টির বাড়িঘর ভাংচুরের কথা ¯^xKvi করে গোলাম হোসেন জানান- পূর্বে লিপাই মিয়ার লোকজন ভাংচুর করে দেখালে আমার লোকজন এর প্রতিশোধ নিয়েছে মাত্র। তিনি বলেন- লুটপাটের কোনো ঘটনা ঘটেনি, নারী নির্যাতনের ঘটনাও সত্য নয়। আর এক পা বাড়িয়ে গোলাম হোসেনের ছোট ভাই গোলাম আহমদের স্ত্রী রুখসানা আক্তার জানান-লিপাই মিয়ার লোকজনই তাদের নিজেদের বাড়িঘর ভাংচুর করেছে, লুটপাট করেছে। নিজেদের মা বোনদের বেইজ্জতিও করেছে তারাই। উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে ফাসানো! ১২ b‡f¤^‡ii পূর্বের দিন নবীগঞ্জ থানা পুলিশকে কেন তার বাড়িতে দাওয়াত খাওয়ানো হয়েছিল এমন প্রশ্নের জবাবে গোলাম হোসেন বলেন- আমি তো সামাজিক মানুষ। ডিসি এসপি ওসি ইউএনও আমার এলাকায় আসলে কার বাড়িতে দাওয়াত খাবে বলুন? তারা তো আমার মেহমান হয়েই আসেন। আমি মেহমানদের আদর আপ্যায়ন করাই মাত্র। সংঘর্ষের ঘটনার সাথে ওসিকে দাওয়াত খাওয়ানোর কোনো সম্পর্ক নাই।
=গ্রামে আতংক ॥ স্কুলে শিক্ষার্থী নেই=
কসবা গ্রামে আতংক বিরাজ করছে। প্রাইমারী স্কুলে শিক্ষার্থী নেই। আতংকে শিক্ষার্থীরা স্কুলে যাচ্ছে না। কসবা প্রাইমারী স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৭১জন। গতকাল দুপুরে গিয়ে দেখা গেছে স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা সর্বোচ্চ ১৫/১০জন। প্রধান শিক্ষক বিজয় কৃষ্ণ দাস জানান- সংঘর্ষের পর ছাত্ররা স্কুলে আসতে চাচ্ছে না। আমি নানাভাবে যোগাযোগ করেও শিক্ষার্থীদের স্কুলে আনতে ব্যর্থ হচ্ছি। তিনি জানান- সমাপনী পরীক্ষার্থী রাবেয়া বেগম আলেয়া ও শিলা আক্তার বৃষ্টি নামের ২ শিক্ষার্থী ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। সংঘর্ষে অনেক শিক্ষার্থীও আহত হয়েছে। বারবার গ্রামে সংঘর্ষের কারণে এলাকায় শিক্ষার মান বৃদ্ধি পাচ্ছে না। এসএসসি পরীক্ষার্থী ফাহিয়া সুলতানা চুমকি জানায়- হামলাকারীরা তার বই পুস্তক সব নিয়ে গেছে। গুরুত্বপূর্ণ খাতাও পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। আর ২মাস পর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণই এখন তার অনিশ্চিত। এসএসসি পরীক্ষার্থী আরেক ছাত্রী নিগার সুলতানা লিভা জানায়- পানি খাওয়ার গাসটি পর্যন্ত তাদের ঘরে নেই। বাথরুমে গিয়ে আত্বরক্ষা করেও নিস্তার মিলেনি। অন্তত ৫০জন নারী ও কিশোরীর শিলতাহানীর কথা ¯^xKvi করে লিভা জানায়- গোলাম হোসেনের পক্ষের সশস্ত্র যুবকরা লুটপাটের সাথে সাথে নারী ও কিশোরীদের চরমভাবে বেইজ্জিতি করে। ভাগ্যগুনে তারা রক্ষা পেয়েছে বলেও জানায় লিভা ও চুমকি। অনেক নারী ও কিশোরী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছে ১২ b‡f¤^i কিভাবে তাদের উপর গোলাম হোসেনের নরপিশাচ যুবকরা হামলে পড়ে। নারীদের উপর এমন নৃশংস বর্বর হামলা নির্যাতনকে ১৯৭১ সালের যুদ্ধের ভয়াবহতাকে স্মরণ করিয়ে দেয় বলে জানিয়েছেন গ্রামের বৃদ্ধারা।
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)

